মনজুর মোর্শেদ তুহিন (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের খারিজ্জমা থেকে চিকনিকান্দি বাজার পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার বিস্তৃত কমলাকান্ত নদী যা স্থানীয়দের কাছে কুমারখালী নদী বা চিকনিকান্দি নদী নামেও পরিচিত কিন্তু তা আজ প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। একসময়ের খরস্রোতা এই নদী এখন ভরাট, দখল আর অব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে মৃতপ্রায় খালে। নদীটি পুনঃখননের অভাবে এর দুই তীরের হাজারো মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
একসময় এই নদীতে পাশাপাশি দুটি লঞ্চ চলাচল করত। ইঞ্জিনবিহীন নৌকায় পাল তুলে দিনভর মানুষ যাতায়াত করত। উলানিয়া থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত নৌপথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই নদী। নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা গ্রামগুলোর মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পানির প্রধান উৎস ছিল কমলাকান্ত নদী।
বর্তমানে সেই নদী শুধুই স্মৃতি। নদীর দুই তীরে বসবাস করা ষাটোর্ধ্ব মানুষের কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নদীটি এখন তাদের কাছে শুধুই স্বপ্নের মতো। তবে তাদের আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তারা চান, মরা খালে আবার জোয়ার-ভাটার টলমলে পানি ফিরুক, সেই পানিতে সেচ দিয়ে আবার দুই পাশের জমিতে ফসল ফলুক। জীবনের শেষ বেলায় হলেও তারা যেন আবার দেখতে পারেন নদীর সেই পুরোনো রূপ।
এই প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের গুরুত্বপূর্ণ মরা খালগুলো পুনঃখননের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্যোগ এখনো পৌঁছায়নি কমলাকান্ত নদীতে। নদীটি পুনঃখননের দাবিতে স্থানীয়রা একাধিকবার জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে আবেদন করলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃতপ্রায় এই ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি কলাগাছিয়া ও চিকনিকান্দি ইউনিয়নের অন্তত ৯টি গ্রাম এবং ১৭টি ইউপি ওয়ার্ডের বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর দুই পাশে কলাগাছিয়া, খারিজ্জমা, কল্যাণকলস, কুমারখালী, কালারাজা, পানখালি, কচুয়া, মাঝিগ্রাম ও চিকনিকান্দি গ্রামের দুই ইউনিয়নে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস।
একসময় এই নদীতে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল করত। নদীর বিভিন্ন স্থানে দুই পাশে প্রায় ১০টি উপশাখা বা খাল ছিল, যেগুলো দিয়ে কৃষিজমিতে পানি প্রবাহিত হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওইসব শাখা-খাল বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব শাখা-খালের ভেতরে কিছু দূর পরপর বাঁধ দিয়ে প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করছেন। ফলে কৃষকরা খরা মৌসুমে প্রয়োজনের সময় জমিতে সেচের পানি দিতে পারছেন না।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে নদীর স্রোত ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। আর প্রায় ২০ বছর আগে নদীটি কার্যত মরা খালে পরিণত হয়। এরপর থেকেই নদীর দুই পাশের আবাদি জমিতে পানির সংকট দেখা দেয়। ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক কৃষক পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পানি ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের পানির অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, খারিজ্জমা থেকে চিকনিকান্দি পর্যন্ত পুরো ১১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীটির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। নদীর মাঝখানজুড়ে বুনো গাছপালা জন্মেছে। কোথাও কোথাও নিচু জায়গায় সামান্য পানি জমে আছে। নদীর পাড় ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই চর দখল করে সেখানে গাছ লাগিয়েছেন, কেউ ফসল চাষ করছেন, আবার কোথাও ঘরবাড়িও নির্মাণ করা হয়েছে।
নদীর তীরবর্তী এলাকায় রয়েছে ছয়টি বাজার। এর মধ্যে নদীর তীর দখল করে প্রায় অর্ধশত পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে পারাপারের জন্য স্থানীয় উদ্যোগে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। আবার কিছু স্থানে স্থানীয়রা নিজেদের অর্থায়নে আধাপাকা সেতুও তৈরি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী মালেক শিকদার বলেন, ছোট সময় আমরা দেখছি এটা বিশাল নদী ছিল, এখন খাল হয়ে গেছে। আশেপাশে বাঁধ দিয়ে কেউ পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি এখানে বড় বড় লঞ্চ চলতো। আমরা এই লঞ্চে যাতায়াত করতাম।
স্থানীয় বৃদ্ধ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই নদীতে উলানিয়া থেকে পটুয়াখালী লঞ্চ চলাচল করতো। ওই লঞ্চে আমরা যাতায়াত করতাম। এখন লঞ্চ চলবে কিভাবে! খালই নাই, সব গেছে ভরে। চাষাবাদের পানিও পাই না। এই খালে গরু গোসল করানোর মতো পানিও নাই।
কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কৃষক নেপাল বাড়ী বলেন, আমি একজন চাষী। তরমুজ, ধান চাষ করি, পানের বহর আছে আমার। পানির অভাবে আমরা খুবই কষ্টে আছি। বর্তমান সরকার যদি এ খালকে খনন করে দিত তাহলে আমাদের পানির কষ্ট দূর হয়ে যেত।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, এই ১১ কিলোমিটার খালের মাঝখানে তিনটা সুইজগেট আছে। বর্তমানে তিনটা সুইজগেট সারা বছর বন্ধ থাকে তাই এখানে কোন পানি আসা যাওয়া করে না। ২০২৩ সালে পটুয়াখালী ডিসি বরাবর আমি একটি আবেদন করেছিলাম এই খালটি পুনর খনন করার জন্য যাতে খালে অন্তত পানি আসে এবং নৌকা চলাচল করে। কিন্তু খাল খনন নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। সেই আবেদন এখনো আমার কাছে আছে। খালটি পুনর খনন করলে সুইজগেট খোলা রেখে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা যাবে। কিছু মানুষ এই খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে পুকুর তৈরি করে মাছ চাষ করতেছে।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের সকল নদী-নালা খাল বিল খনন করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। গলাচিপা উপজেলায় আমরা শতাধিক খালের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করেছি। কমলাকান্ত খালটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
তবে দীর্ঘদিন ধরে নদীটি ভরাট, দখল এবং পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় দুই ইউনিয়নের হাজারো মানুষ বিশেষ করে কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত কমলাকান্ত নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু নদীই প্রাণ ফিরে পাবে না, বরং কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ সহ সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অন্যথায় একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই নদীটি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।